কাষ্ঠহারি জাতক | Kasthahari Jataka

0.0 / 5 (0 টি ভোট)

পুরাকালে বারাণসী নগরে ব্রহ্মদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। একদিন রাজা ব্রহ্মদত্ত বনমধ্যে একা একা বিহার করছিলেন। এমন সময় তিনি দেখতে পেলেন, এক রমণী গান গাইতে গাইতে কাঠ কুড়োচ্ছে। তার রূপ দেখে রাজা এমনই মুগ্ধ হয়ে গেলেন যে, তিনি তখনই তাকে কাছে ডাকলেন। রাজার সাথে সেই রমণীর আলাপ হলো এবং তিনি সেই বনেই তাকে গান্ধর্ব মতে বিবাহ করলেন। এরপর বোধিসত্ত্ব সেই রমণীর গর্ভে প্রবেশ করলেন।

রাজা যখন বুঝতে পারলেন যে সেই রমণী অন্তঃসত্ত্বা, তখন তিনি নিজের নাম খোদাই করা একটি আংটি তাকে দিলেন। রাজা বললেন, ‘যদি তুমি কন্যা প্রসব করো, তাহলে এই আংটি বেচে তার ভরণপোষণ চালাবে। আর যদি পুত্রসন্তান হয়, তাহলে এই আংটিসহ তোমার পুত্রকে আমার কাছে নিয়ে যাবে।’ এই বলে রাজা বিদায় নিলেন।

যথাকালে সেই রমণী বোধিসত্ত্বকে প্রসব করলেন। বোধিসত্ত্ব যখন একটু বড় হলেন এবং পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলা করে বেড়াতে লাগলেন, তখন পাড়ার ছেলেরা তাঁকে ‘নিষ্পিতক’ অর্থাৎ পিতৃপরিচয়হীন বলে উপহাস করত। যখন তখন তাদের কেউ কেউ বলত, ‘এই দেখ, নিষ্পিতক আমাকে মেরে গেল।’ কেউ আবার বলত, ‘নিষ্পিতক আমাকে ধাক্কা দিল।’

এতে বালক বোধিসত্ত্বের মনে বড় আঘাত লাগল। তিনি একদিন তাঁর মাকে বললেন, ‘আমার বাবা কে মা?’ মা বললেন, ‘তুমি রাজার ছেলে বৎস।’ বোধিসত্ত্ব অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি রাজার ছেলে হলে আমরা রাজবাড়িতে থাকি না কেন? তাছাড়া আমি যে রাজার ছেলে, তার প্রমাণ কী?’

মা তখন আংটির রহস্য খুলে বললেন। তিনি বললেন, ‘রাজা যখন আমাকে ছেড়ে চলে যান, তখন তিনি আমাকে একটি নামাঙ্কিত অঙ্গুরি দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি কন্যা হয় তাহলে এটি বেচে তার ভরণপোষণ করতে। আর যদি পুত্রসন্তান হয়, তবে এই অঙ্গুরিসহ তাকে রাজার কাছে নিয়ে যেতে।’ মায়ের কথা শুনে বোধিসত্ত্ব ব্যাকুল হয়ে বললেন, ‘তাহলে আমাকে বাবার কাছে নিয়ে চলো না কেন?’

ছেলের ব্যাকুলতা দেখে রমণী একদিন বোধিসত্ত্বকে সঙ্গে নিয়ে রাজভবনে উপস্থিত হলো। রাজার কাছে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে সে সোজা সিংহাসনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। রাজাকে প্রণাম করে সে বলল, ‘মহারাজ, এই আপনার পুত্র।’ রাজসভার সবার সামনে এই কথা শুনে রাজা মনে মনে খুব বিরক্ত হলেন। তিনি সব মনে থাকলেও না জানার ভান করলেন। তিনি রুক্ষ স্বরে বললেন, ‘এই ছেলে আমার পুত্র হবে কেন?’

রমণী তখন আংটিটি দেখিয়ে বলল, ‘মহারাজ, এই দেখুন আপনার নামাঙ্কিত আংটি। এটি আপনি বিদায়বেলায় আমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন।’ কিন্তু রাজা অস্বীকার করে বললেন, ‘এই অঙ্গুরি আমার নয়।’

রমণী তখন নিরূপায় হয়ে বলল, ‘এখন দেখছি ধর্ম ছাড়া আমার অন্য কোনো সাক্ষী নেই। আমি ধর্মের দোহাই দিয়ে বলছি, যদি এই বালক আপনার পুত্র হয়, তবে ও যেন মধ্য আকাশে স্থির হয়ে থাকে। আর যদি ও আপনার পুত্র না হয়, তবে ও উঁচু আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে মৃত্যুমুখে পতিত হবে।’ এই বলে সে বোধিসত্ত্বের দুটি পা ধরে তাঁকে উপরের দিকে ছুঁড়ে দিল।

উপরে উঠেই বোধিসত্ত্ব জাদুকরীভাবে নিচে না পড়ে মাঝ আকাশে বীরাসনে বসলেন। এরপর তিনি রাজাকে ধর্মোপদেশ দান করলেন। তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘শোনো মহারাজ, আমি তোমার ধর্মপত্নীর গর্ভজাত সন্তান। সুতরাং আমাকে গ্রহণ করো। রাজার আশ্রয়ে কত মানুষ অন্ন পায়, আমি তোমার নিজের সন্তান হয়ে কেন তা পাব না?’

বালক বোধিসত্ত্বের মুখে এমন গভীর কথা শুনে রাজার চৈতন্য হলো। তিনি বুঝতে পারলেন এই বালক কোনো সাধারণ শিশু নয়। তিনি দুহাত বাড়িয়ে বললেন, ‘এসো বৎস, এসো। এখন থেকে আমিই তোমার দায়িত্ব নেব।’ তখন সভার আরও অনেক লোক বোধিসত্ত্বকে কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু বোধিসত্ত্ব কেবল রাজার কোলেই গিয়ে উঠলেন।

রাজা তখন বোধিসত্ত্বকে উপরাজ এবং তাঁর মাকে প্রধান মহিষী করলেন। কালক্রমে রাজার মৃত্যু হলে বোধিসত্ত্ব ‘মহারাজ কাষ্ঠবাহন’ উপাধি গ্রহণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ন্যায়নিষ্ঠভাবে রাজ্য শাসন করেন।

নীতিকথা: সত্যকে কখনো ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায় না; সত্য তার আপন মহিমায় একদিন প্রকাশ পাবেই।


শব্দার্থ ও টীকা:

  • গান্ধর্ব মতে বিবাহ: প্রাচীনকালের এক বিশেষ ধরনের বিবাহরীতি যা পাত্র-পাত্রীর পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পন্ন হতো।
  • নিষ্পিতক: যার পিতা নেই বা যার পিতৃপরিচয় জানা নেই।
  • অঙ্গুরি বা অঙ্গুরীয়: হাতের আঙুলে পরার আংটি।
  • বীরাসনে: বীরের মতো বসার একটি বিশেষ ভঙ্গি।
  • উপরাজ: প্রধান রাজার পরেই যাঁর পদমর্যাদা বা সহকারী রাজা।
  • চৈতন্য হওয়া: ভুল বুঝতে পারা বা জ্ঞান ফিরে পাওয়া।

গল্পটি কেমন লাগলো? রেটিং দিন:

রেটিং দিতে দয়া করে লগ-ইন করুন।

বর্তমান রেটিং: 0.0/5 (মোট 0 টি ভোট)

Leave a Comment