📖 Read this story in English
প্রাচীনকালে বারাণসী নগরে ব্রহ্মদত্ত নামে এক রাজা রাজত্ব করতেন। সেই সময়ে বোধিসত্ত্ব এক সচ্ছল বণিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কালক্রমে বড় হয়ে তিনি পৈতৃক বাণিজ্যেই মন দিলেন। তাঁর অধীনে ছিল পাঁচশো গরুর গাড়ি। সেই সব গাড়িতে মূল্যবান পণ্যসম্ভার বোঝাই করে তিনি কখনো পূর্ব দেশে, আবার কখনো পশ্চিম দেশে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতেন।
সেই একই বারাণসী নগরে আরেকজন বণিক বাস করত। সে ছিল অত্যন্ত হঠকারী ও নির্বোধ। কোন অবস্থায় কী সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সে বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র প্রজ্ঞা ছিল না।
দুই বণিকের ভিন্ন পথ ও প্রজ্ঞা একবার বোধিসত্ত্ব তাঁর শকটগুলোতে দামী মালপত্র বোঝাই করে দূরদেশে যাওয়ার সংকল্প করলেন। ঘটনাক্রমে তিনি জানতে পারলেন, সেই নির্বোধ বণিকটিও পাঁচশো গাড়িতে মাল বোঝাই করে একই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি শেষ করেছে।
তখন বোধিসত্ত্ব মনে মনে চিন্তা করলেন, এক হাজার গাড়ি, দুই হাজার বলদ আর বিপুল সংখ্যক লোকজন নিয়ে দুই বণিকের একসঙ্গে যাত্রা করা মোটেও সমীচীন হবে না। এতগুলো গাড়ির চাকার ঘর্ষণে রাস্তা ভেঙে ধূলিসাৎ হবে, আর পথে মানুষ ও পশুর জন্য খাদ্য ও পানীয়ের বড় সংকট দেখা দেবে। তাই তিনি সেই নির্বোধ বণিককে ডেকে অত্যন্ত সহজভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বললেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, “বন্ধু, আমাদের একসঙ্গে যাওয়া ঠিক হবে না। এখন তুমি ভেবে দেখো, তুমি আগে যাবে নাকি পরে?”
নির্বোধ বণিক মনে মনে ভাবল, আগে গেলে সে অটুট রাস্তা পাবে, তার বলদগুলো তাজা ঘাস পাবে, আর মানুষেরা পাবে বনের কচি ফলমূল। এমনকি সে নিজের ইচ্ছামতো পণ্যের দামও ঠিক করতে পারবে। তাই সে দম্ভভরে আগে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বোধিসত্ত্ব মনে মনে ভাবলেন, পরে যাওয়াতেই আসলে প্রজ্ঞা আছে। ওদের গাড়িগুলো যাওয়ার ফলে উঁচু-নিচু রাস্তা সমান হবে। ওদের বলদগুলো পুরোনো ঘাস খেয়ে ফেলার পর আমার বলদগুলো নতুন ও কচি ঘাস পাবে। ওরা পথে জলের জন্য যে কূপ খনন করবে, আমরা অনায়েসেই তা ব্যবহার করতে পারব। এমনকি ওদের ঠিক করা দামেই আমি দরাদরি না করে পণ্য বিক্রি করতে পারব।
মরুপথে যক্ষরাজের মায়াজাল নির্বোধ বণিক যাত্রা করার দিনকয়েক পর বোধিসত্ত্ব তাঁর যাত্রা শুরু করলেন। এদিকে সেই নির্বোধ বণিক লোকালয় ছেড়ে ষাট যোজন বিস্তৃত এক গভীর ও জনহীন অরণ্যে প্রবেশ করল। সেখানে পানীয় জল না থাকায় তারা প্রচুর পরিমাণে জলের ভাণ্ড সঙ্গে নিয়েছিল।
সেই অরণ্যে হিংস্র যক্ষেরা বাস করত। যক্ষরাজ বণিকদের গাড়িগুলো দেখতে পেয়ে এক নিষ্ঠুর পরিকল্পনা করল। সে ভাবল, এদের জলের পাত্রগুলো যদি ফেলে দেওয়া যায়, তবে এরা তৃষ্ণায় দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তখন অনায়েসেই তাদের ভক্ষণ করা যাবে। এই ভেবে যক্ষরাজ মায়াবলে এক শ্বেতশুভ্র শকট ও সিক্ত বস্ত্রধারী রূপ ধারণ করল। তার গলায় ছিল শ্বেতপদ্মের মালা, মাথার চুল ভেজা এবং গাড়ির চাকাগুলো ছিল কাদামাখা—যেন সে কোনো সজল অঞ্চল থেকে স্নান সেরে আসছে।
নির্বোধ বণিকের মুখোমুখি হয়ে যক্ষরাজ মধুর স্বরে বলল, “আপনারা কোথা থেকে আসছেন? সামনে তো অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে, চারিদিকে পদ্মফুলে ভরা সরোবর। আপনারা কেন অযথা এই ভারী জলের জালাগুলো বয়ে বেড়াচ্ছেন? এগুলো ভেঙে ফেলে গাড়ি হালকা করুন।” নির্বোধ বণিক সেই মায়াবী রূপ ও মিষ্ট কথায় বিশ্বাস করে সব জল ফেলে দিয়ে জালাগুলো ভেঙে ফেলল। যক্ষরাজ তার অনুচরদের নিয়ে নিজ পুরীতে ফিরে গেল। কিন্তু অনেকদূর এগিয়েও বণিক কোথাও জলের চিহ্ন পেল না। তৃষ্ণায় ও ক্ষুধায় কাতর হয়ে তারা যখন গভীর ঘুমে মগ্ন হলো, তখন যক্ষেরা বেরিয়ে এসে সেই বণিক ও তার অনুচরদের বধ করে তাদের মাংস ভক্ষণ করল। পথে পড়ে রইল কেবল হাড়কঙ্কাল আর পণ্যবোঝাই গাড়িগুলো।
বোধিসত্ত্বের সত্যনিষ্ঠা ও জয় যাত্রার দেড় মাস পর বোধিসত্ত্ব সেই অরণ্যের মুখে এসে পৌঁছালেন। তিনি জানতেন এই পথ দুর্গম, তাই পর্যাপ্ত জলের ভাণ্ড সাথে নিলেন। অরণ্যে প্রবেশের আগে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিলেন, “এখানে কোনো বিষবৃক্ষের ফল বা অচেনা জল আমার অনুমতি ছাড়া কেউ গ্রহণ করবে না।”
কিছুদূর এগোতেই সেই যক্ষরাজ পুনরায় আবির্ভূত হলো এবং সেই একই মিথ্যে বৃষ্টির গল্প শোনাল। কিন্তু বোধিসত্ত্ব লক্ষ্য করলেন—সেই ব্যক্তির চোখ রক্তবর্ণ, মূর্তি উগ্র এবং মাটিতে কোনো ছায়া পড়ছে না। তিনি বুঝে নিলেন এটি কোনো মানুষ নয়, বরং এক মায়াবী যক্ষ। তিনি বজ্রকণ্ঠে বললেন, “দূর হ পাপিষ্ঠ! আমরা বণিক, নিজের চোখে জল না দেখে আমরা সঞ্চিত জল ফেলব না। যখন প্রয়োজন হবে, নিজের বুদ্ধিতেই কাজ করব।”
বোধিসত্ত্ব তাঁর প্রলুব্ধ অনুচরদের বুঝিয়ে বললেন, “যদি বৃষ্টি হতো, তবে শীতল বাতাস বইত, আকাশে মেঘ দেখা যেত। তোমরা কি তার কিছুই পেয়েছ?” অনুচরেরা ভুল বুঝতে পারল। তারা দ্রুতবেগে পথ অতিক্রম করে দেখল, আগের বণিকের হাড়কঙ্কাল ও গাড়িগুলো পড়ে আছে। সেই রাতে তারা অত্যন্ত সতর্কভাবে সেখানে অবস্থান করল এবং পরদিন সেই পরিত্যক্ত মূল্যবান মালপত্রগুলো নিজ গাড়িতে তুলে নিল। গন্তব্যে পৌঁছে বোধিসত্ত্ব সেই মালপত্র বহুগুণ দামে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করলেন এবং নিরাপদে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন।
নীতি কথা: নির্বোধ ব্যক্তিরা সত্যকে ত্যাগ করে মিথ্যার মোহ ও প্রলোভনে সহজেই ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু প্রজ্ঞাবান মানুষেরা বিচারবুদ্ধি দিয়ে সত্য যাচাই করেন, যা তাঁদের কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা করে।