বালুকাপথ জাতক| Balukapatha Jataka

0.0 / 5 (0 টি ভোট)


বোধিসত্ত্ব একবার এক বণিকের গৃহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বড় হয়ে তিনি বাণিজ্যে প্রবৃত্ত হন। তাঁর পাঁচশো গরুর গাড়ি ছিল। সেই সব গাড়িতে পণ্য বোঝাই করে নানা স্থানে বাণিজ্য করে বেড়াতেন তিনি।

একবার বাণিজ্যে বের হয়ে তিনি এক বিশাল মরুভূমিতে প্রবেশ করেন। সেই মরুভূমির বালি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তা হাতের মুঠোয় ধরা যেত না, মুঠো করলেই আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ত। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই বালি আগুনের মতো গরম হয়ে উঠত। তখন তার ওপর দিয়ে আর পথ চলা যেত না।

মরুভূমির রুক্ষ প্রকৃতি ও পথচলা

তাই অন্যান্য পথিকদের মতো বোধিসত্ত্বও দিনের বেলায় এক জায়গায় শিবির খাটিয়ে বিশ্রাম করতেন। রাতের বেলায় তাঁরা পথ চলতেন। সমুদ্রে নাবিকেরা যেমন নক্ষত্র দেখে পথ চলে, মরুপথিকদেরও তেমনি রাতে নক্ষত্র দেখেই পথ চিনতে হতো। নক্ষত্র দেখে যারা পথ চিনতে পারত, তাদের বলা হতো স্থান-নিয়ামক। সব মরুযাত্রীদের দলেই এমন একজন করে স্থান-নিয়ামক থাকত।

বোধিসত্ত্বের দলেও একজন স্থান-নিয়ামক ছিল। সে রাত্রিবেলায় নক্ষত্র দেখে কোন পথে যেতে হবে, তা বলে দিত। সেদিন বোধিসত্ত্ব ভাবলেন, আজ রাতেই আমরা মরু অঞ্চল পার হয়ে যেতে পারব।

ভুল পথে যাত্রা ও ঘোর বিপদ

কিন্তু সেই রাতেই ঘটল এক দারুণ বিপত্তি। সামনের গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে স্থান-নিয়ামক গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে। ফলে সে আর পথ দেখাতে পারল না। আর গাড়িগুলো সব উল্টো পথে চলতে থাকল।

এদিকে বোধিসত্ত্ব ভেবেছিলেন, সেই রাতেই তাঁরা মরুভূমি পার হয়ে যাবেন। তাই সন্ধ্যার আহারের পর তিনি জল, কাঠ প্রভৃতি জিনিস অনাবশ্যক ভেবে ফেলে দেওয়ার আদেশ দেন।

গাড়িগুলো উল্টো পথ দিয়ে সারারাত চলল। ভোরবেলায় স্থান-নিয়ামকের ঘুম ভাঙল। তখন সে ‘গাড়ি ঘোরাও, গাড়ি ঘোরাও’ বলে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু তখন আর কোনো উপায় নেই। সূর্য ততক্ষণে উঠে পড়েছে। দেখা গেল, যেখান থেকে তাঁরা যাত্রা শুরু করেছিলেন, ঠিক সেখানেই আবার ফিরে এসেছেন।

তখন অনুচরেরা বলতে লাগল, ‘আমরা তো জল, কাঠ সব ফেলে দিয়েছি। এখন আমরা কী খেয়ে বাঁচব?’ এই বলে তারা বিলাপ করতে করতে গাড়ি থামাল। তারপর গরুগুলোকে খুলে দিয়ে চরম হতাশায় গাড়ির তলায় শুয়ে পড়ল।

পাথরের নিচে আশার আলো

কিন্তু চরম বিপদকালেও ধৈর্য ধারণের অসীম ক্ষমতা ছিল বোধিসত্ত্বের। তিনি ভাবলেন, এখন নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকলে এতগুলো প্রাণী অকালে মারা যাবে। এই ভেবে তিনি জলের সন্ধানে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।

কিছুদূর গিয়ে এক জায়গায় তিনি একগুচ্ছ কুশ ঘাস দেখতে পেলেন। তখন তিনি বুঝতে পারলেন, নিশ্চয়ই এর নিচে জল আছে। তা না হলে এই শুকনো মরুভূমিতে কখনো কুশ জন্মাতে পারে না। এই ভেবে তিনি তাঁর অনুচরদের কোদাল দিয়ে সেখানে কুয়ো খনন করতে বললেন।

ষাট হাত নিচেও জল পাওয়া গেল না। উল্টে দেখা গেল সেখানে কোনো মাটি নেই, শুধু পাথর আর পাথর। পাথরের গায়ে কোদালের কোনো চোটই লাগল না। বোধিসত্ত্ব তখন কুয়োর নিচে নেমে গেলেন। সেই পাথরের ওপর কান পেতে তিনি ভেতরে জলপ্রবাহের শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, ওই পাথরের নিচেই জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে।

অধ্যবসায়ের জয়

তখন তিনি ওপরে উঠে এলেন। তাঁর এক যুবক ভৃত্যকে ডেকে বললেন, ‘তুমি একটা বড় হাতুড়ি নিয়ে নিচে নেমে যাও। পাথরের ওপর ক্রমাগত ঘা মারতে থাকো। ওর ঠিক নিচেই জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে। তুমি এখন উদ্যমহীন হলে আমরা সকলেই মারা পড়ব।’

যুবকটি ছিল বলিষ্ঠ ও উদ্যমশীল। অন্য সকলে হতাশ হয়ে বসে পড়লেও, সে একা বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে প্রভুর আদেশ পালন করল। হাতুড়ির ঘায়ে একসময় সেই পাথর ফেটে গেল। আর অমনি স্বচ্ছ জলের এক ফোয়ারা প্রবল বেগে ওপরে উঠে এল। তখন সকলের আনন্দ আর দেখে কে!

সবাই সেই শীতল জলে স্নান করল এবং পানের জল প্রচুর পরিমাণে তুলে রাখল। তারপর রান্নার ব্যবস্থা হলো। সঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু কাঠের দ্রব্য ছিল। সেগুলো চিরে জ্বালানি কাঠ হিসেবে ব্যবহার করা হলো।

খাওয়া-দাওয়ার পর সন্ধ্যার সময় তাঁরা গন্তব্যের দিকে রওনা হলেন। অবশেষে নিরাপদে বাণিজ্যস্থানে পৌঁছে গেলেন। সেখানে বোধিসত্ত্ব তাঁর সমস্ত পণ্যদ্রব্য দ্বিগুণ, এমনকি চতুর্গুণ লাভে বিক্রি করে প্রচুর আয় করলেন। এভাবেই সফলতার সঙ্গে কাজ সেরে তাঁরা স্বদেশে ফিরে এলেন।

নীতিকথা

কোনো কাজে সাময়িক ব্যর্থ হয়ে জ্ঞানীজন চুপ করে বসে থাকেন না। তাঁরা অধ্যবসায়ের সঙ্গে কাজ করে ঠিকই সাফল্য লাভ করেন।


শব্দার্থ ও টীকা:

  • প্রবৃত্ত হওয়া: মন দেওয়া বা কাজে যুক্ত হওয়া।
  • স্থান-নিয়ামক: মরুভূমিতে যারা নক্ষত্র দেখে পথের দিক নির্ণয় করে (পথপ্রদর্শক)।
  • অনাবশ্যক: যার কোনো প্রয়োজন নেই বা অপ্রয়োজনীয় বস্তু।
  • অনুচর: সঙ্গী, সেবক বা ভৃত্য।
  • নিশ্চেষ্ট: চেষ্টা ছাড়া বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া।
  • কুশ: এক প্রকার ধারালো লম্বা ঘাস (যা সাধারণত ভেজা মাটিতে জন্মায়)।
  • উদ্যমশীল: যার কাজের প্রতি প্রবল উৎসাহ ও চেষ্টা আছে।
  • অধ্যবসায়: অবিরাম চেষ্টা বা লক্ষ্য পূরণে লেগে থাকা।

গল্পটি কেমন লাগলো? রেটিং দিন:

রেটিং দিতে দয়া করে লগ-ইন করুন।

বর্তমান রেটিং: 0.0/5 (মোট 0 টি ভোট)

Leave a Comment