পুরাকালে বারাণসী নগরে ব্রহ্মদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। তাঁর সময় বোধিসত্ত্ব শ্রেষ্ঠীকুলে জন্মগ্রহণ করেন। যৌবনে তিনি শ্রেষ্ঠীপদে নিযুক্ত হন। তখন তিনি চুল্লশ্রেষ্ঠী উপাধি পান। তিনি পরম বিদ্বান ও বুদ্ধিমান ছিলেন। এমনকি আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান দেখেও তিনি গণনা করতে পারতেন।
একদিন বোধিসত্ত্ব রাজদর্শন করতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় পথে তিনি একটি মৃত ইঁদুর দেখতে পেলেন। তখন আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান দেখে তিনি বলে উঠলেন, ‘যদি কোনো সদ্বংশজাত ব্যক্তি এই মৃত ইঁদুরটি তুলে নিয়ে যায়, তবে সে ব্যবসায় অনেক উন্নতি করবে।’
এই সময় সেই পথ দিয়ে ভদ্রবংশের এক নিঃস্ব যুবক যাচ্ছিল। সে বোধিসত্ত্বের কথা শুনে ভাবল, ইনি তো না জেনে কোনো কথা বলেন না। ইনি যখন বলছেন, তখন মরা ইঁদুরটা তুলে নিয়ে দেখি ভাগ্য ফেরে কি না। এই ভেবে সে মরা ইঁদুরটা তুলে নিয়ে গেল।
এই সময় কাছেই এক দোকানদার তার পোষা বিড়ালের জন্য খাবার খুঁজছিল। সে যুবকের কাছ থেকে এক পয়সা দাম দিয়ে ইঁদুরটা কিনল। যুবকটি তখন সেই এক পয়সা দিয়ে গুড় কিনল। তারপর এক কলসি জল নিয়ে সে এমন এক পথে গিয়ে বসল, যে পথে মালাকারেরা বন থেকে ফুল তুলে ফেরে। মালাকারেরা ফুল এনে ক্লান্তভাবে সেখানে বসলে যুবকটি তাদের প্রত্যেককে একটু গুড় ও একপাত্র করে জল দিল। তা খেয়ে তৃপ্ত হয়ে মালাকারেরা তাকে এক মুঠো ফুল দিল।
যুবকটি তখন সেই ফুল বেচে আরো বেশি গুড় কিনল। পরদিন ফুলের বাজারে গিয়ে সে আবার মালাকারদের গুড় ও জল খাওয়াল। মালাকারেরা তখন খুশি হয়ে তাকে কতকগুলি ফুটন্ত ফুলের গাছ দিল। এইভাবে ফুল ও ফুলগাছ বেচে মাত্র চারদিনের মধ্যেই তার আট টাকা পুঁজি হলো।
তারপর একদিন খুব ঝড়বৃষ্টি হলো। তার ফলে রাজার বাগানে অনেক শুকনো ও কাঁচা ডালপালা ভেঙে পড়ল। বাগানের মালী একা সে সব সরিয়ে বাগান পরিষ্কার করতে পারছিল না। তখন সেই যুবক তার কাছে গিয়ে বলল, ‘তুমি যদি আমাকে বিনামূল্যে এই সব ডালপালা দিয়ে দাও, তাহলে আমি তোমার বাগান পরিষ্কার করে দেব।’ মালী তাতে রাজি হয়ে গেল। যুবক তখন পাড়ার ছেলেদের একটু করে গুড় খেতে দিয়ে বলল, ‘তোমরা আমার সঙ্গে এসো, বাগানটা পরিষ্কার করে দিই।’ ছেলেরা খুশি হয়ে তার সঙ্গে গেল। তারা যুবকের সঙ্গে মিলে সব ভাঙা ডালপালা বাগান থেকে তুলে আনল। তারপর সেগুলো রাস্তার ওপর গাদা করে রাখল।
সেদিন রাজার কুম্ভকারের কাঠের অভাব পড়েছিল। সে হাঁড়ি-কলসি পোড়াবার জন্য কাঠ কিনতে বেরিয়ে শুকনো ডালপালার গাদা দেখতে পেল। সে নগদ ষোল টাকা ও কিছু হাঁড়ি দিয়ে যুবকের কাছ থেকে সব ডালপালা কিনে নিল।
সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে যুবকের হাতে তখন চব্বিশ টাকা রইল। সে তখন এক নতুন উপায়ের সন্ধান করল। বারাণসীতে পাঁচশো ঘেসেড়া লোক ছিল, যারা প্রতিদিন মাঠে ঘাস কাটতে যেত। যুবকটি নগরের বাইরে এক জায়গায় গিয়ে বসল। ঘেসেড়ারা পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লে যুবক তাদের জল পান করাল। ঘেসেড়ারা তৃপ্ত হয়ে বলল, ‘ভাই, তুমি আমাদের এত উপকার করছ। বলো, আমরা তোমার জন্য কী করতে পারি?’
যুবক বলল, ‘তার জন্য এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? যখন প্রয়োজন হবে, আমি ঠিক বলব।’
এই সময় যুবকের সঙ্গে এক স্থলপথ-বণিক ও এক জলপথ-বণিকের বন্ধুত্ব হয়। একদিন স্থলপথ-বণিক যুবককে জানাল যে, কাল এক অশ্ববিক্রেতা এই নগরে পাঁচশো ঘোড়া নিয়ে আসবে।
এই কথা শুনে যুবক ঘেসেড়াদের কাছে গিয়ে বলল, ‘ভাইসব, কাল তোমরা প্রত্যেকে আমাকে এক আঁটি করে ঘাস দেবে। আর আমার ঘাস বেচা না হওয়া পর্যন্ত তোমরা কেউ ঘাস বেচবে না।’ ঘেসেড়ারা তাতেই রাজি হয়ে যুবকের কথামতো কাজ করল। পরদিন অশ্বব্যবসায়ী কোথাও ঘাস না পেয়ে যুবকের কাছ থেকে এক হাজার টাকা দাম দিয়ে সেই পাঁচশো আঁটি ঘাস কিনল।
এর দিনকতক পর জলপথ-বণিক জানাল, বন্দরে একটি বড় জাহাজ মাল নিয়ে আসছে। যুবক তখন আর একটি মতলব আঁটল। সে দিন-ভাড়ায় একটি গাড়ি এনে তাতে চড়ে বন্দরে গিয়ে উপস্থিত হলো। সেখানে সে জাহাজের সব মালের দাম ঠিক করে নিজের নামাঙ্কিত আংটি দিয়ে বায়না করল। অর্থাৎ, সেই জাহাজের কোনো মাল কিনতে হলে এখন তার মধ্য দিয়েই কিনতে হবে।
যুবকটি এবার বন্দরে একটি তাঁবু খাটিয়ে শিবির বানাল। তারপর কয়েকজন অনুচর নিয়ে সেখানে থাকতে লাগল। সে অনুচরদের বলে দিল, কোনো বণিক তার সঙ্গে দেখা করতে এলে তাকে যেন একে একে তিনজন করে আরদালি সঙ্গে নিয়ে ভেতরে আনা হয়।
এদিকে বন্দরে বড় জাহাজ এসেছে শুনে প্রায় একশো বণিক সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। কিন্তু তাঁরা শুনলেন, কোনো এক মহাজন একাই সমস্ত মাল বায়না করে নিয়েছেন। তখন তাঁরা খোঁজ করে সেই যুবকের শিবিরে উপস্থিত হলেন।
শিবিরের ঘটা এবং আরদালির ছড়াছড়ি দেখে তাঁরা ভাবলেন, এই যুবক নিশ্চয়ই অতুল সম্পদের অধিকারী। তাঁরা এক একজন করে যুবকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং মালের এক এক অংশ পাওয়ার জন্য এক হাজার টাকা করে লাভ দিতে রাজি হলেন। এরপর যুবকের নিজের যে অংশ ছিল, তা কেনার জন্য তাঁরা এক লক্ষ টাকা লাভ দিলেন। এইভাবে যুবক দুই লক্ষ টাকা লাভ করে বারাণসীতে ফিরে গেল।
যুবক দেখল, বোধিসত্ত্বের পরামর্শ মতো কাজ করেই সে এতো বিত্ত লাভ করেছে। তাই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সে এক লক্ষ টাকা নিয়ে বোধিসত্ত্বকে দিতে গেল।
বোধিসত্ত্ব তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কীভাবে এমন বিত্তশালী হলে?’
যুবক তখন সব বৃত্তান্ত খুলে বলল। সে জানাল, সেই মরা ইঁদুর তুলে নিয়ে তার থেকে মাত্র চার মাসের মধ্যে সে এই বিপুল ধন লাভ করেছে। তা শুনে বোধিসত্ত্ব বিবেচনা করলেন যে, যুবকের এই ধন যাতে অন্য কারো হাতে না পড়ে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। এই কথা ভেবে তিনি তাঁর প্রাপ্তবয়স্কা কন্যার সঙ্গে যুবকের বিবাহ দিলেন। বোধিসত্ত্বের অন্য কোনো সন্তান ছিল না। তাই যুবক তাঁর সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হলো এবং বোধিসত্ত্বের মৃত্যুর পর বারাণসীর মহাশ্রেষ্ঠীর পদ লাভ করল।
নীতিকথা: বুদ্ধিমান ও উদ্যমী মানুষ সামান্য সুযোগকে কাজে লাগিয়েও জীবনে চূড়ান্ত সাফল্য ও বিপুল সম্পদের অধিকারী হতে পারেন।
শব্দার্থ ও টীকা:
- শ্রেষ্ঠীকুল: ধনী ব্যবসায়ী বা বণিকদের বংশ।
- সদ্বংশজাত: যে ব্যক্তি ভালো বা অভিজাত বংশে জন্মগ্রহণ করেছে।
- নিঃস্ব: যার কোনো ধনসম্পদ নেই, অত্যন্ত গরিব।
- মালাকার: যারা ফুল তুলে মালা গাঁথে বা ফুল বিক্রি করে।
- কুম্ভকার: যারা মাটি দিয়ে হাঁড়ি, কলসি বা পাত্র তৈরি করে (কুমার)।
- ঘেসেড়া: যারা মাঠে বা জঙ্গলে ঘাস কাটে।
- নামাঙ্কিত: নিজের নাম লেখা বা খোদাই করা রয়েছে এমন কিছু (যেমন আংটি)।
- মহাশ্রেষ্ঠী: রাজ্যের প্রধান বা সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী।