আজ হতে চার যুগ আগে বোধিসত্ত্ব সেরিবা রাজ্যে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যৌবনে তিনি ফেরিওয়ালার কাজ করে জীবিকার্জন করতেন। তাঁর নাম ছিল সেরিবান।
সেই রাজ্যে সেরিবা নামে আরও এক ফেরিওয়ালা বাস করত। একদিন বোধিসত্ত্ব সেরিবাকে সঙ্গে নিয়ে অন্ধরূপ নগরে বাণিজ্য করতে গিয়েছিলেন। সেরিবা ছিল খুবই অর্থলোভী। সেই নগরে গিয়ে কে কোন রাস্তায় ফেরি করে বেড়াবেন, তা তাঁরা ভাগ করে নিয়েছিলেন। ঠিক হয়েছিল, একজন এক রাস্তায় ফেরি করার পর অন্যজন সেই রাস্তায় ফেরি করতে পারবেন।
পূর্বে সেই অন্ধরূপ নগরে সম্পত্তিশালী এক শ্রেষ্ঠী পরিবার বাস করত। পরে লক্ষ্মীদেবীর কোপে পড়ে সেই পরিবার সব সম্পত্তি হারিয়ে নির্ধন হয়ে পড়ে। একে একে সেই পরিবারের পুরুষেরা সব মারা যান। যে সময়ে বোধিসত্ত্ব সেই নগরে বাণিজ্য করতে যান, সেই সময় সেই শ্রেষ্ঠী পরিবারে মাত্র একটি বালিকা ও তার বৃদ্ধ পিতামহী জীবিত ছিলেন।
তাঁরা অতি কষ্টে প্রতিবেশীদের বাড়িতে কাজকর্ম করে জীবিকার্জন করতেন। অতীতে সৌভাগ্যের সময় বাড়ির কর্তা একটি সোনার থালায় ভোজন করতেন। সেটি তখনো তাঁদের কাছে ছিল। কিন্তু দীর্ঘকাল সেটিকে ব্যবহার করা হয়নি। অন্যান্য ভাঙা বাসনপত্রের সঙ্গে পড়ে থাকায় সেটির ওপর এত ময়লা জমেছিল যে, সেটি সোনার পাত্র বলে আর চেনা যেত না।
একদিন লোভী ফেরিওয়ালা সেরিবা ‘কলসী কিনবে’, ‘কলসী কিনবে’ বলতে বলতে সেই শ্রেষ্ঠীদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তখন সেই পরিবারের ছোট বালিকাটি তার ঠাকুমাকে বলল, আমাকে একটা গয়না কিনে দাও না। ঠাকুমা বললেন, ‘আমরা গরিব লোক, গয়না কেনার পয়সা কোথায় পাব?’
তখন বালিকাটি সোনার থালাটা বের করল। সে তার ঠাকুমাকে সেটি দেখিয়ে বলল, ‘এই থালাখানা বদলে নিলেই তো হয়। ওটা তো আমাদের কোনো কাজে লাগে না।’
বৃদ্ধা তাতে কোনো আপত্তি করলেন না। তিনি ফেরিওয়ালাকে ডেকে বললেন, ‘মহাশয়, এই থালাখানির বদলে আপনার এই ছোট বোনটিকে যা হোক একটা জিনিস দিন।’
সেরিবা থালাখানি নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল। সে বুঝল সম্ভবত এটি সোনার থালা। কিন্তু সেটি প্রকৃত সোনার থালা কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য সে একটি সুঁচ দিয়ে তার ওপর দাগ কেটে দেখল। তখন সেটি যে সোনার, সে বিষয়ে তার আর কোনো সন্দেহ রইল না।
কিন্তু লোভী সেরিবা ভাবল যে সে বিনা পয়সায় এটি নেবে। তাই সে সত্য কথা গোপন করল। অবজ্ঞার ভান করে সে বলল, ‘এর আর দাম কী? এটি সিকি পয়সা অর্থাৎ এক পয়সার চারভাগের এক ভাগ দামে কিনলেও ঠকা হয়।’ এই বলে বাসনখানি সে হেলাভরে মাটিতে ফেলে দিয়ে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরেই বোধিসত্ত্ব সেই রাস্তায় ফেরি করতে এলেন। তিনিও সেরিবার মতো একই কথা বলে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে লাগলেন। তা শুনে সেই বালিকাটি তার ঠাকুমাকে সেই একই অনুরোধ করল। তখন ঠাকুমা তাকে বললেন, ‘দেখলে তো, এই বাসনটার কোনো দাম নেই। আর আমাদের বদল করার মতো অন্য কোনো কিছু নেই।’
তখন বালিকাটি বলল, ‘আগের ফেরিওয়ালা লোকটা ভালো ছিল না। তার কথাবার্তাও ভালো নয়। কিন্তু এই ফেরিওয়ালাটি ভালো, লোকটির কথাও ভালো। এ হয়তো বাসনটা কিনতে পারে।’
ঠাকুমা তখন বোধিসত্ত্বকে ডাকলেন এবং সেই বাসনখানি দেখালেন। সেটি হাতে পাওয়ামাত্র বোধিসত্ত্ব বুঝতে পারলেন যে এটি সোনার। তিনি বললেন, ‘মা, এর দাম তো অনেক, লক্ষ মুদ্রা! কিন্তু এত অর্থ তো আমার কাছে নেই।’
তাঁর কথায় সন্তুষ্ট হয়ে বৃদ্ধা বললেন, ‘এইমাত্র একজন ফেরিওয়ালা এসেছিল। সে বলল, এর দাম এক সিকিও হবে না। বোধ হয় আপনার পুণ্যবলে এটি সোনা হয়ে গেছে। এটি আমরা আপনাকেই দেব। এর বিনিময়ে আপনার যা ইচ্ছে দিন।’
বোধিসত্ত্বের কাছে তখন পাঁচশো রুপোর টাকা এবং সমমূল্যের পণ্যদ্রব্য ছিল। তিনি তা থেকে মাত্র আটটি টাকা এবং নিজের দাঁড়িপাল্লা ও থলেটি রেখে দিলেন। বাকি সব টাকা ও দ্রব্য তিনি বৃদ্ধাকে দিয়ে দিলেন। তারপর তিনি সেই সোনার থালাটি নিয়ে সোজা নদীতীরে চলে গেলেন।
নদীর ঘাটে গিয়ে তিনি মাঝিকে আট টাকা দিলেন এবং তাড়াতাড়ি নদী পার করে দিতে বললেন। তিনি নৌকায় বসামাত্র মাঝি নৌকা ছেড়ে দিল।
এদিকে সেরিবা নিজের লোভ সামলাতে পারল না। সে শ্রেষ্ঠীদের বাড়িতে ফিরে এসে বলল, ‘আপনাদের থালাটার বদলে কিছু একটা জিনিস না দিলে ভালো দেখায় না।’
তখন বৃদ্ধা বললেন, ‘কিন্তু একটু আগে একজন সাধু ফেরিওয়ালা সেটি হাজার টাকা দিয়ে নিয়ে গেছেন। অথচ আপনি বলেছিলেন তার দাম নাকি সিকি পয়সাও নয়!’
কথাটা শুনে সেরিবা সঙ্গে সঙ্গে পাগলের মতো হয়ে ওঠে। সে তার সব টাকা ও মালপত্র মাটিতে ছড়িয়ে ফেলে দেয়। শুধু দাঁড়িপাল্লাটা নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে সে রাস্তা দিয়ে ছুটতে লাগল আর বলতে লাগল, ‘আমার লক্ষ মুদ্রার সোনার থালাটা নিয়ে গেছে!’
সেরিবানের সন্ধানে সে নদীতীরে ছুটে গেল। কিন্তু গিয়ে দেখল নৌকা ছেড়ে দিয়েছে। সে বারবার ডাকলেও মাঝি আর নৌকা ফেরাল না। তখন সেরিবা ক্ষুধাতৃষ্ণায় ও শোকে-দুঃখে এতই কাতর হয়ে পড়ল যে তার হৃৎপিণ্ড ফেটে গেল এবং মুখ দিয়ে রক্ত উঠতে লাগল। সে তৎক্ষণাৎ প্রাণত্যাগ করল। এভাবেই সেরিবা তার অতিলোভের ফল পেল, আর বোধিসত্ত্ব পেলেন তাঁর সাধুতার ফল।
নীতিকথা: লোভ মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। অন্যদিকে সততা ও সাধুতা মানুষকে সর্বদা সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দেয়।
শব্দার্থ ও টীকা:
লক্ষমুদ্রা: এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা বা বিপুল পরিমাণ অর্থ।
বোধিসত্ত্ব: গৌতম বুদ্ধের পূর্বজন্মের রূপ।
শ্রেষ্ঠী: ধনী ব্যবসায়ী বা বণিক।
পিতামহী: ঠাকুমা বা দাদি।
নির্ধন: যার কোনো ধন বা সম্পদ নেই, অতি গরিব।
সিকি: এক টাকার চার ভাগের এক ভাগ বা পঁচিশ পয়সা।
হেলাভরে: অত্যন্ত অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে।